জীবন গাঁথায় এম এন লারমাঃ চার দফা দাবি – পাহাড়ের স্বপ্ন( ৫ম পর্ব)

Jumjournal

August 31, 2025

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশ নতুন রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নিল। চারদিকে স্বাধীনতার উল্লাস, নতুন সংবিধান তৈরির ব্যস্ততা। কিন্তু পাহাড়ি মানুষের চোখে তখনো কাপ্তাই বাঁধের ক্ষত শুকায়নি।

এই প্রেক্ষাপটেই এম এন লারমা বুঝলেন—যদি এখনই পাহাড়িদের অধিকার সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত না করা যায়, তবে ভবিষ্যতে সমস্যা আরও তীব্র হবে। তাই তিনি একদিন কলম তুলে নিলেন। লিখলেন চারটি স্পষ্ট দাবি—

১. স্বায়ত্তশাসন: পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা পরিষদসহ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ঘোষণা করতে হবে।
২. আইনি সুরক্ষা: ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা CHT Regulation, 1900 বজায় রাখতে হবে। কারণ এ আইনেই পাহাড়ি ভূমি ও সংস্কৃতির সুরক্ষা নিহিত।
৩. রাজপ্রথার স্বীকৃতি: চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা প্রথাগত রাজপ্রথাকে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
৪. সাংবিধানিক নিশ্চয়তা: উপরের সব কিছুর জন্য সংবিধানে গ্যারান্টি থাকতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে সরকার একতরফা বদলাতে না পারে।

১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে এই চার দফা তুলে ধরলেন।

গণপরিষদে নাটকীয় মুহূর্ত

৩১ অক্টোবর ১৯৭২। গণপরিষদে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬ পাস হওয়ার দিন। সেখানে লেখা হলো—
“জাতি হিসেবে জনগণ বাঙালি এবং নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশি।”

লারমা দাঁড়িয়ে আপত্তি জানালেন। তাঁর কণ্ঠ কাঁপছিল না। বললেন—
“আমি বাংলাদেশি নাগরিক, কিন্তু আমি চাকমা। আমাকে বাঙালি বলা যাবে না।”

চারদিক থেকে চিৎকার উঠল—
“সে কী কথা!”
“এটা দেশদ্রোহিতা!”

কিন্তু তিনি মাথা নত করলেন না। যখন ভোটে অনুচ্ছেদ পাস হলো, তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে গণপরিষদ থেকে ওয়াকআউট করলেন।

একা কিন্তু অদম্য

লারমা তখন ছিলেন প্রায় একা। সংখ্যায় পাহাড়িরা খুবই কম, রাজনৈতিক শক্তিও সীমিত। তবু তিনি এই একাকী সংগ্রাম চালিয়ে গেলেন। তাঁর জন্য সংসদ কেবল আইন করার জায়গা ছিল না—এ ছিল পাহাড়ের কণ্ঠস্বর শোনানোর মঞ্চ

সংসদে বসে থাকা তাঁর সহকর্মীরা হয়তো বুঝতে পারেননি, কিন্তু ইতিহাসের পৃষ্ঠায় সেই মুহূর্ত অমর হয়ে রইল।

©Jumournal-2026

M. N. LARMA

BACK TO TOP